“হরিপুর উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য” মোঃ করিমুল হক।

(প্রথম অধ্যায়-২য় পর্ব)

2
312

হরিপুরের জমিদার এবং জমিদার বাড়ি সম্পর্কে তথ্য নির্ভর, বস্তুনিষ্ঠ বা প্রামাণ্য দালিলিক অস্তিত্ব প্রায় বিরল । হরিপুরের আদিনাম জীবনপুর। কালের চক্রে তৎকালীন আরণ্যক আর অনুর্বর জীবনপুরেই প্রতিষ্ঠা পায় হরিপুর জমিদারি।
ব্যাপক লোকশ্রুতি, সমসাময়িক কিছু লেখনি, আর দূর্বল ঐতিহাসিক তথ্য মতে জানা যায়, খোলড়া পরগনার নাশকি জমিদার ছিলেন কামরুন্নাহার। তবে তাঁর বাসস্থান ঠিক কোন মৌজায় ছিল সে সম্পর্কে তথ্য নির্ভর কোন সূত্র পাওয়া যায় না। তিনি বিধবা এবং অপুত্রক ছিলেন। তাঁর জমিদারির কোন উত্তরাধিকারী না থাকায় তিনি একজন নাবালক কে দত্তক গ্রহণ করেন। ফলে জমিদারি পরিচালনার জন্য তাঁর নায়েব হরিমোহন হয়ে উঠেন জমিদারির সর্বেসর্বা। সরকারের খাজাঞ্চিখানায় খাজনা দিতে গিয়ে হরিমোহন খাজনার সমুদয় টাকা আত্মসাৎ করেন এবং জমিদারের ভয়ে জীবনপুর মৌজার ঘন জঙ্গলে আত্মগোপন করেন। বেশ কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর হরিমোহন সাহস করে আত্মপ্রকাশ করলে কামরুন্নাহার তাঁকে জীবনপুর মৌজায় আবিষ্কার করেন এবং অভিশাপ দেন, যেন হরিমোহনও নির্বংশ থাকেন। পরবর্তীতে হরিমোহন “হরিপুর” নাম দিয়ে জীবনপুরেই নতুন জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। অনেকের ধারণা, হরিমোহনের বংশধররাই হরিপুর জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন। যদিও হরিমোহনের বংশানুক্রম বা উত্তারাধিকারী সম্পর্কে তথ্যনির্ভর কোন ইতিহাস পাওয়া যায় না। একথা সত্য যে, তদানীন্তন ভারতবর্ষে বহু পীর,আউলিয়া, দরবেশ কিংবা প্রভাবশালী হিন্দু গোত্রের শিরোমণিদের নামে বহু স্থানের নামকরণ হয়েছে এবং তা আজও বিদ্যমান, সে কারণে হরিমোহনের নামে হরিপুরের নামকরণ হয়তো যৌক্তিক।
তবে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন,হরিপুর জমিদার বাড়ি নির্মাণের প্রাগুক্ত ধারণার কোন দালিলিক ভিত্তি বা ঐতিহাসিক মূল্য নাই। তাঁদের মতে প্রকৃত ইতিহাস হচ্ছে নিম্নরূপঃ
দিল্লির সম্রাটের আনুকূল্যে বাংলার ইতিহাসে ১৩৩৮ থেকে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ২০০ বছর ছিল মুসলমান সুলতানদের স্বাধীন রাজত্বের যুগ। ইলিয়াস শাহী বংশের শেষ সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের একজন উচ্চপদস্থ অমাত্য ছিলেন রাজা গণেশ। আজম শাহের মৃত্যুর পর রাজা গণেশ নিজেকে হরিপুরের নিকটবর্তী ভাতুরিয়া পরগনার রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি ছিলেন লোভী এবং উচ্চাভিলাষী। নিজেকে রাজা ঘোষণার পর তিনি তাঁর বাহিনীকে সুসজ্জিত করে একের পর এক অঞ্চল আক্রমণ করে উত্তরবঙ্গের পান্ডুয়া, পূর্ববঙ্গের সোনারগাঁ এবং দক্ষিণ পূর্বে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাঁর রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটান। রাজ্য শাসন কালে তিনি অসংখ্য সুধী সাধককে হত্যা করে তাঁর রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটান। রাজা গণেশ এর উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীন সুলতানি আমলে হিন্দু রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করা। সুধী- সাধক হত্যার ঘটনা তৎকালীন মুসলিম আলেম ও দরবেশদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। এ সময় দরবেশ কুল শিরোমণি নূরে কুতুবে আলম পার্শ্ববর্তী জৌনপুর রাজ্যের সুলতান ইব্রাহিম শার্কিকে রাজা গণেশের মুসলিম নিধন ও অত্যাচার বিষয়ে চিঠি লিখে নিজেদের রক্ষার জন্য অনুরোধ করেন। ইব্রাহিম শার্কি দরবেশদের আবেদনে সাড়া দিয়ে ভাতুরিয়া আক্রমণের জন্য রওয়ানা হন।
ইব্রাহিম শার্কির আগমনে ধূর্ত রাজা গণেশ ভয় পেয়ে স্বেচ্ছায় সুলতানের সংঙ্গে আনুগত্যের চুক্তিতে আবদ্ধ হন। চুক্তির শর্তমতে গনেশ তাঁর বড় ছেলে যদুকে ইসলাম ধর্মে দিক্ষীত করে জালালুদ্দিন মাহামুদ নাম দিয়ে রাজসিংহাসনে বসান। ইব্রাহিম শার্কি জৌনপুর ফিরে গেলে রাজা গণেশ তাঁর পুত্র যদুকে পুনরায় হিন্দু ধর্মে দিক্ষীত করে নিজেই সিংহাসনে বসেন। পিতাপুত্রের বিরোধ তুংগে উঠে। ফলে, পু্ত্র জালালুদ্দিন ক্ষুব্ধ হয়ে রাজা গনেশকে সিংহাসনচ্যুত করে আবার নিজেকে রাজা ঘোষনা করেন। ১৪১৮ সালে রাজা গনেশের মৃত্যু হলে পিতাপুত্রের ৩৮ বছরের রাজত্বের অবসান ঘটে এবং তাঁদের রাজ্য বিলীন হয়ে ভাতুরিয়া পুনরায় পরগণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
ঠিক এই সময়ে খোলড়া এবং প্রাচীন জামুন পরগনার জমিদার ছিলেন মেহেরুন্নেসা। তিনি জামুন গ্রামে বাস করতেন এবং সেখানেই তাঁর জমিদারি পরিচালনার জন্য কাচারি ছিল। তিনিও বিধবা ছিলেন। “সরকার তাজপুরের” নির্দেশে ভাতুরিয়া পরগনা তাঁর জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হলে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে তিনি তাঁর জমিদারির “কাচারি” জামুন থেকে জীবনপুর মৌজার হরিপুর নামক স্থানে স্থানান্তরিত করেন। জমিদারির আদায়কৃত খাজনা তিনি “সরকার তাজপুরের” শিকদার এর নিকট জমা দিতেন। বিধবা হওয়ার কারণে তাঁর জমিদারির প্রশাসনিক কাজকর্ম দূর্বল হয়ে পড়ে। খাজনা আদায়ে নিযুক্ত কর্মচারীদের শৈথিল্য,খরা এবং প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলে বেশকিছু বছরের খাজনা বাকি পড়ে যায়। এমতবস্থায়,বকেয়া খাজনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে “সরকার তাজপুরের” নির্দেশে তাঁর জমিদারি নিলামে উঠে।
এ সময় ঘন শ্যাম কুণ্ড নামে তৎকালীন এক ধনাঢ্য কাপড় ব্যবসায়ী মেহেরুন্নেসার জমিদারি কিনে নেন। ঘনশ্যাম কুন্ডুর উত্তরাধিকারী পুত্র রাঘবেন্দ্র রায় চৌধুরী। ঐতিহাসিকদের মতে, রাঘবেন্দ্র রায় চৌধুরী হরিপুর জমিদার বাড়ির নির্মাণকাজ প্রথমে শুরু করলেও তাঁর জীবদ্দশায় তা সম্পন্ন করতে পারেননি। পরবর্তীতে তাঁর দুই পুত্র যোগেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ও নগেন্দ্র বিহারী রায় চৌধুরী ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে উত্তর ও দক্ষিণ দালান নামে হরিপুর জমিদার বাড়ির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই রাঘবেন্দ্র রায় চৌধুরীর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে নির্মিত জমিদার বাড়ির উত্তরাংশ ছোটভাই নগেন্দ্র বিহারী রায় চৌধুরী এবং দক্ষিণাংশ বড় ভাই যোগেন্দ্র নারায়ন রায় চৌধুরীর মধ্যে ভাগাভাগি হয়।
(পরবর্তী অংশ আসছে…)
তথ্যসূত্রঃ
১। অঙ্গীকার, করিমুল হক মঞ্জু সম্পাদিত,
১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দ।
২। হরিপুরের ইতিহাস, হামিদুর রহমান চৌধুরী,
১৯৮৬ খ্রিঃ।
৩। আইন-ই-আকবরী, ডঃ আবুল ফজল।
৪। বাংলায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস, প্রফেসর
মোঃ আবদুল করিম।
৫। ঠাকুরগাঁও পরিক্রমা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য,
ঠাকুরগাঁও ফাউন্ডেশন -২০০৫ খ্রিঃ।
৬। ঠাকুরগাঁও জেলার ইতিহাস, অজয় কুমার
রায়, ২০১৬ খ্রিঃ।
(লেখকসহ দক্ষিণ জমিদার বাড়ির একাংশ)

2 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে