সেলফোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিবারের আয় বাড়াচ্ছে ১০%

গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য

0
126

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি ও নারীর ক্ষমতায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে সেলফোন। বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছায়নি এমন এলাকায় পরিবারের অকৃষি খাতের নানা ব্যবসায় সেলফোন ব্যবহারের মাধ্যমে অতিরিক্ত ৭ থেকে ১১ শতাংশ আয় বাড়ছে। অন্যদিকে মত্স্য চাষে এখন একজন খামারি সেলফোনের মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি করতে পারছে ৭-১০ শতাংশ পর্যন্ত। বিদ্যুিবহীন প্রান্তিক এলাকায় সেলফোন ব্যবহারের কারণে পরিবারে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে তা নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

‘মোবাইল ফোনস, হাউজহোল্ড ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ওমেন’স এম্পাওয়ারমেন্ট: এভিডেন্স ফ্রম রুরাল অফ-গ্রিড রিজিওনস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ গবেষণাটি গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘ইনফরমেশন টেকনোলজি ফর ডেভেলপমেন্ট’-এর অনলাইনে সংস্করণে গবেষণাটি প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষণাটিতে ২০১৬ ও ২০১৭ সালের সেলফোন ব্যবহারের প্রভাব ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. মনজুর হোসেন ও বিশ্বব্যাংকের হোসাইন সামাদ।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি পরিবারে সেলফোন থাকলে তা পণ্য বিপণন, যাতায়াত খরচ ও সময় সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখে। এর ফলে একটি পরিবারের উৎপাদনশীলতা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়। সেলফোন ব্যবহারের কারণে মাছ ধরার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি বা জেলেদের আয় ৭ থেকে ১০ শতাংশ বাড়ে। কারণ এর মাধ্যমে জেলেরা মাছের বাজার সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পান, যা তাদের ভালো দাম পেতে সহায়তা করে। সেলফোন ব্যবহারে তৃৃণমূলে নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেলফোনের মাধ্যমে নারীর নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ঘরের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা, পরিবার পরিকল্পনা ও শিশুদের শিক্ষার মতো কাজে নারীরা এখন মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। এতে পরিবারের মধ্যে নারীর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এ বিষয়ে গবেষকদ্বয়ের অন্যতম বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. মনজুর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, সেলফোনের ব্যবহার প্রান্তিক অঞ্চলে নারীর ক্ষমতায়ন ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতির উন্নতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেশ জোরালো ভূমিকা নিচ্ছে। ফলে সেটিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে মোবাইল ফোনের ব্যবহারকে আরো সহজলভ্য করতে হবে, তথ্যভিত্তিক ব্যবসায়িক লিঙ্কেজ জোরদার করা। সেটি করতে মোবাইল ফোনের বিদ্যমান ট্যারিফ কাঠামো, ইন্টারনেট সুবিধা এবং অবকাঠামোগত আরো উন্নয়ন প্রয়োজন। তাহলে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নে মোবাইল ফোন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।

গবেষণাটি যে সময় পরিচালনা করা হয় সে সময় বাংলাদেশে সেলফোনের সংযোগ সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ কোটি। এ সংযোগ সংখ্যা এরই মধ্যে ১৬ কোটি ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে গ্রামীণফোনের সংযোগ সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ কোটি ৫৩ লাখ ৩৩ হাজার, বাংলালিংকের ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৭৩ হাজার, রবির ৪ কোটি ৯৭ লাখ ১৮ হাজার এবং টেলিটকের ৪৯ লাখ ১৩ হাজার।

গবেষণায় বলা হয়েছে, সেলফোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মুক্তির পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতেও সহায়ক ভূমিকা রাখে। যে পরিবারে সেলফোন নেই, দুর্যোগে তাদের ভোগ ব্যয় কমে ৮ শতাংশ। আর যাদের সেলফোন আছে, তাদের ভোগব্যয় আগের মতোই থাকে। দুর্যোগের পর সেলফোন ব্যবহারকারী পরিবারের খাদ্য ঘাটতিতে পড়ার আশঙ্কা প্রায় ৩ শতাংশ কমে যায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে-২০১৯’ প্রতিবেদনে তথ্যমতে, সারা দেশে প্রায় ৯৬ শতাংশ পরিবারে বা খানায় সেলফোন ও বিদ্যুতের আওতায় এসেছে ৯৩ শতাংশ পরিবার। তবে ইন্টারনেটের সেবার বাইরে এখনো ৬২ শতাংশ পরিবার এবং কম্পিউটার নেই ৯৪ শতাংশ পরিবারে। ফলে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বহুমুখী সুবিধা ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে অবকাঠামো উন্নয়ন ও ব্যাপকহারে সম্প্রসারণ প্রয়োজন।

এ বিষয়ে রবি আজিয়াটা লিমিটেডের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের জীবনে মোবাইল সেবা ও স্মার্টফোনের গুরুত্ব কতটা সেটা খুব সহজেই অনুধাবন করা যায় যদি এ যন্ত্রটি কিছু সময়ের জন্য আমাদের হাতে না থাকে। যোগাযোগ, ডিজিটাল সেবা প্রাপ্তি, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আরো এগিয়ে নিতে হলে এখন প্রয়োজন প্রত্যেকের হাতে হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা। সেলফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অবস্থা থেকে এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে, প্রয়োজন সরকার এবং অন্য অংশীদারদের সহযোগিতা। এ বিষয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ এখন সময়ের দাবি।

গবেষণাটিতে বাংলাদেশের নদী, চর, সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকার মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী ৩ হাজার ৫১৬টি খানার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। মোট আটটি জেলার ৯২টি গ্রামের পরিবারের ওপর এ গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে। এসব এলাকার মানুষ সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। জেলাগুলো হলো সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জ, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও ফরিদপুর। এসব এলাকায় প্রায় ৯৩ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবারে সেলফোন রয়েছে। এসব পরিবারের ৭৭ শতাংশ পরিবার প্রধানের সেলফোন সুবিধা ও প্রায় ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারে বিদ্যুতের সুবিধা রয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে