শুধুই সেতু নয়, একটি আবেগের নাম

0
158

বাঙালি জাতির কাছে পদ্মা সেতু আজ একটি আবেগের নাম। পদ্মার দুই তীরের হাজার হাজার মানুষ, যারা নিজের শেষ আশ্রয়, বাপ-দাদার কবর, ফসলি জমির মায়া ছেড়ে দিয়ে বুনেছেন স্বপ্নের জাল, তাদের দুই চোখেও আজ আনন্দ অশ্রু। এই সেতু প্রমাণ করেছে কোনও প্রতিশ্রুতি সুদৃঢ় হলে যেকোনও দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব। প্রমাণ করেছে এমন এক খরস্রোতা নদীও হার মানে বাঙালির দৃঢ়তার কাছে।

হার মানাদের তালিকায় বিশ্বব্যাংকের নামও আসবে। কেননা, এই সেতু প্রমাণ করে দিলো বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ দাঁড় করায়। সবকিছু ছাপিয়ে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের আলোচনা, সমালোচনা উপেক্ষা করে যখন ৪১টি স্প্যান পদ্মার দুই পারকে একত্রিত করেছে, তখন দেশপ্রেমিক প্রতিটি মানুষের আবেগে গলা ধরে আসবেই। আর তাই পদ্মা সেতু নিছক কোনও সেতু নয়, একটি আবেগের নাম। এমন মন্তব্য পদ্মার দুই পারের মানুষের।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ১০ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা ২ মিনিটে ৪১তম ‘পাপড়ি’ স্থাপনের মধ্য দিয়ে প্রস্ফুটিত হতে চলেছে বাংলাদেশের সক্ষমতার ‘পদ্ম’। তারা জানিয়েছেন, দুর্নীতির অপবাদ ঘুচিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর নদীজনিত বিচ্ছিন্নতা জয় করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারের সাফল্যের মুকুটে তিনি যোগ করলেন আরও এক হিরন্ময় পালক।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানিয়েছেন, ‘স্বপ্ন’কে দৃশ্যমান করতে গাঢ় কুয়াশায়, কখনও প্রখর রোদে, কখনও তীব্র শীতে কিংবা ঘন বর্ষায় ১৬৯ বার পদ্মা সেতু প্রকল্পের সাইট পরিদর্শন ও নিবিড় তদারকি করেছেন যিনি, তিনি বর্তমান সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যতবার সড়ক কিংবা আকাশ পথে পদ্মা অতিক্রম করেছেন, পরম মমতায় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেছেন নির্মাণাধীন সেতুটিকে। সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চেয়েছেন প্রকল্পের অগ্রগতি। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশের হাজার হাজার প্রকল্পের তদারকি বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে ছেড়ে দিলেও প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিশেষ তদারকি করেছেন পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ।

নির্মাণ প্রকল্পের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে যা জানা গেছে

১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য পদ্মা সেতু নির্মাণের এই প্রকল্পের ব্যয় শেষ পর্যন্ত কয়েক দফা বাড়িয়ে ৩০ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। সেতুর ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, স্বপ্নটা তো বড়। সব সময় ভালোটার দিকেই চোখ যায়। ভালোটা চোখে পড়লে চোখ সেখানেই আটকে থাকে। একতলা ব্রিজ করলে তো খরচ অনেক কম হতো। বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে নির্মাণ হচ্ছে দ্বিতল সেতু। যার ওপর দিয়ে গাড়ি আর নিচ দিয়ে রেল চলবে। বানানো হচ্ছে কংক্রিট ও স্টিলের সমন্বয়ে। যা বিশ্বে বিরল। ব্যয় তো বাড়বেই।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, এটি একটি সম্ভাবনাময় অবকাঠামো। যা বাংলাদেশের সম্পদ। এই সেতু দেশের জিডিপিতে অবদান রাখবে ১ দশমিক ২ শতাংশ। দেশের ১৬ কোটি মানুষকে এক সুতোয় গাঁথবে। সব অসম্ভবকে সম্ভব করে আজ সেতুর পুরো ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান। এটিই বাস্তবতা। এই সেতু নির্মাণে নানা ধরনের কুসংস্কারও এসেছিল অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করতে। সব কাটিয়ে পদ্মার দুই পারের মানুষ আজ উৎসব করছে। এটিই এখন ইতিহাস।

মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিমের বাসিন্দা ৮২ বছর বয়স্ক সাবেক শিক্ষক সেকান্দার আলী হাওলাদার জানিয়েছেন, ‘যে নদীর স্রোতে প্রতিবছর শত শত একর জমি বিলীন হয়ে গেছে, হাজার হাজার ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়েছে, সেই নদীর ওপর দিয়ে গাড়ি আর মানুষ চলবে; এটা চিন্তা তো দূরের কথা, কল্পনাও করি নাই।’

আজ সেই অকল্পনীয় বিষয়টিই বাস্তব হয়েছে। আগে কেউ এই নদীতে ব্রিজ হবে বললে লোকে তাকে পাগল বলেছে। আজ বাস্তবতাকে অস্বীকার করলেই লোকে তাকে ভর্ৎসনা করবে। বুকে সাহস আর দেশের প্রতি মমতা না থাকলে এটি সম্ভব হতো না বলে মনে করেন সেকান্দার আলী।

সূত্র জানিয়েছে, পদ্মা একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। এর মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের সঙ্গে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর যুক্ত হয়েছে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব অংশের সরাসরি সংযোগ ঘটবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য পদ্মা সেতু ছিল চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। দুই স্তরবিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ব্রিজটির ওপরের স্তরে রয়েছে চার লেনের সড়ক পথ এবং নিচে একটি একক রেলপথ। পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর অববাহিকায় ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যর ৪১টি স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে ৬ দশমিক ১৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৮ দশমিক ১০ মিটার প্রস্থ পরিকল্পনায় নির্মিত হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় এই সেতু। এটির জন্য প্রয়োজনীয় এবং অধিগ্রহণকৃত মোট জমির পরিমাণ ৯১৮ হেক্টর।

সূত্র আরও জানায়, প্রকল্প প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত কিছু লোকের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় বিশ্বব্যাংক তার প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নেয়। অন্যান্য দাতারাও সেটি অনুসরণ করে। পরে দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এই ঘটনায় তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় ও সচিব মোশাররফ হোসেন ভূইয়াকে জেলেও যেতে হয়েছিল। পরে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় কানাডিয়ান আদালত মামলাটি বাতিল করে দেয়।

বর্তমানে প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সম্পদ থেকে অর্থায়ন করা হচ্ছে। এইকম-এর ডিজাইনে বহুমুখী আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প ‘পদ্মা বহুমুখী সেতুর’ নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০১১ সালে এবং শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৩ সালে। মূল প্রকল্পের পরিকল্পনা করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ২০০৭ সালের ২৮ আগস্ট ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা বাজেটে পদ্মা সেতু প্রকল্প পাস করেছিল ওই সরকার। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এসে সেতুতে রেলপথ সংযুক্ত করে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম দফায় ব্যয় সংশোধন করে ধরা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। পরে আরও আট হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়। ২০১৮ সালে ব্যয় বাড়ে আরও ১৪শ কোটি টাকা। এতে শেষতক মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৩০ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকায়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে