রেখাচিত্রের নক্ষত্র কাইয়ুম চৌধুরী

0
217

চিত্রকলা জগতের অন্যতম নক্ষত্র আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। চিত্ররীতির একাধিক মাধ্যম ব্যবহারে দক্ষ চিত্রশিল্পী ছিলেন তিনি। তেলরং, জলরং, মোমরং, রেশম ছাপ ইত্যাদি মাধ্যমে কাজ করেছেন। ছয় দশকের নিরন্তর শিল্প সাধনায় আধুনিক শিল্পধারায় নতুন যুগের সূচনা করেন। কেবল চিত্রকলা নয়, বইয়ের প্রচ্ছদ, অঙ্গসজ্জা, শিরোনাম, ইলাস্ট্রেশনসহ সামগ্রিক শিল্পরুচি বদলে দিয়েছেন এই শিল্পী। শিল্পকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে একুশে পদকের পর পান স্বাধীনতা পুরস্কার। প্রতিবেদন তৈরি করেছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আলতাফ হোসেন

বাংলাদেশে চিত্রকলা জগতের অন্যতম নক্ষত্র আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। চিত্ররীতির একাধিক মাধ্যম ব্যবহারে দক্ষ একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন তিনি। তেলরং, জলরং, মোমরং, রেশম ছাপ ইত্যাদি নানা মাধ্যমে কাজ করেছেন এবং নকশা ছিল তার প্রধানতম অংকনশৈলী। ছয় দশকের নিরন্তর শিল্প সাধনার পথ বেয়ে লোকায়ত শিল্পোর আশ্রয়ে বাংলার আধুনিক শিল্পধারায় নতুন যুগের সূচনা করেন। কেবল চিত্রকলা নয়, বইয়ের প্রচ্ছদ, অঙ্গসজ্জা, শিরোনাম, ইলাস্ট্রেশনসহ সামগ্রিক শিল্পরুচি বদলে দিয়েছেন এই শিল্পী। নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছেন শিল্পের একজন মহীরুহ হিসেবে। শিল্পকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৬ সালে একুশে পদকের পর ২০১৪ সালে পান স্বাধীনতা পুরস্কার।

কাইয়ুম চৌধুরীর শিল্পসত্তা ছিল বহুমাত্রিক; বিচিত্রমুখী। নকশা প্রধান চিত্রাবলী বর্ণোজ্জ্বল ছবি শিল্পীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি তার শিল্পকর্মে তিনটি রং বেশি ব্যবহার করেছেন লাল, নীল ও সবুজ। তার বৈশিষ্ট্য ছিল রূপসী বাংলা, লোকায়ত বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্প। লোকজ উপাদানকে তিনি চিত্রকলায় ফুটিয়ে তুলেছেন অপূর্ব চারুদক্ষতায়। সুদীর্ঘকাল ধরে কাইয়ুম চৌধুরীর রেখা ও রঙে বাংলার চিরায়ত প্রকৃতি ও মানুষ যে অনন্য রূপ-ব্যঞ্জনায় ভাস্বর হয়ে উঠেছে। লোকশিল্পকলার বিষয় ও আঙ্গিক তার চিত্রভুবনকে করেছে একই সঙ্গে জন্মলগ্ন ও রুচিস্নিগ্ধ। পঞ্চাশের দশকে বইয়ের প্রচ্ছদ অংকনে এক উচ্চমান, অভিনবত্ব ও আধুনিক মননের সূচনা করেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। আর তাই সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন অন্যরকম জনপ্রিয়। জহির রায়হানের ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ আঁকার মধ্য দিয়ে এই শিল্পে তার পদচারণা শুরু। বিশ্লেষকরা বলেন, বইয়ের প্রচ্ছদের শিল্পমানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’র প্রচ্ছদশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীই। সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম দিককার গ্রন্থগুলোর প্রচ্ছদও তার তুলিতেই আঁকা হয়।

শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাংলার কৃষক কিষানী, গ্রামবাংলার চিত্রকে তুলে এনেছেন তেল চিত্র ও রেখা চিত্রে। দেশের মাটিকে শিল্পে আন্তর্জাতিক ভাষা দিয়েছেন শিল্পী। বাংলার লোকজ মোটিভকে ব্যবহার করেছেন নানাভাবে। বইর প্রচ্ছদ অলংকরণ, গ্রাফিক্সের কাজ ছাড়া শিল্পীর আরেকটি অনবদ্য কাজ ছিল ‘পোস্টার’ শিল্প।

কাইয়ুম চৌধুরী কোনো নির্লিপ্ত শিল্পী ছিলেন না। যৌবনকাল থেকেই তিনি ছিলেন সমাজসচেতন। রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে পোস্টার এঁকেছেন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের রেখাচিত্র, মুক্তিযুদ্ধের অজস্র ছবি। কাইয়ুম চৌধুরী রাজনীতি করেননি। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, ন্যায়পর সমাজের স্বপ্ন দেখতেন আজীবন এবং তার বাস্তবায়নের নানা প্রয়াসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন তিনি।

কাইয়ুম চৌধুরীর মনকে কেবল চিত্রশিল্প দখল করেনি। সাহিত্য, সংগীত ও চলচ্চিত্রের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল প্রবল। সাহিত্য-কবিতার জগতে তার কর্ম আছে। অনেকগুলো সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখেছেন তিনি। ছোটদের জন্য লেখালেখি করেছেন। তার গ্রামোফোন রেকর্ডের সংগ্রহ ছিল ঈর্ষণীয়। সব ধরনের বাংলা গান এবং ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীত ছিল তার প্রিয়। এসব সংগীতের শিল্পীদের সম্পর্কেও তার জানাশোনা ছিল প্রচুর। বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি চলচ্চিত্রের তিনি শুধু নিবিষ্টচিত্ত দর্শক ছিলেন না, সমালোচকের দৃষ্টি দিয়ে তিনি ছায়াছবি দেখতেন, ঐতিহাসিকের কৌতূহল নিয়ে তার এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ের তথ্য সংগ্রহ করতেন। পঞ্চাশের দশকেই চলচ্চিত্র-বিষয়ে একটি সংকলনের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি, একটা বড় খাতায় তার জন্য কিছু স্কেচও করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটা বাস্তবায়িত হয়নি।

কাইয়ুম ছিলেন অসাধারণ বন্ধুবৎসল মানুষ। অন্তরঙ্গদের কাছে অনায়াসে তিনি মনের অর্গল খুলে দিতেন। বন্ধুত্বের মূল্য তার কাছে ছিল অপরিসীম। যার মধ্যে কিছুমাত্র গুণ দেখতেন, তারই প্রশংসা করতেন, তার শ্রীবৃদ্ধি কামনা করতেন। বন্ধুদের সান্নিধ্যে নানাকথায় আসর জমিয়ে রাখতেন। আর্ট ক্যাম্পগুলোয় তিনি থাকতেন সবকিছুর কেন্দ্রে। প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর ছিলেন তিনি। অনেকেই বলেছেন, তিনি কাউকে কষ্ট দেননি, নিজেও কষ্ট পাননি।

কাইয়ুম চৌধুরী দেশে বিদেশে পুরস্কৃত হয়েছেন কিন্তু সব সময়ই তিনি মনে করতেন তার শিল্পী জীবনের বড় প্রাপ্তি বাংলাদেশের মতো অপূর্ব সুন্দর দেশটিতে জন্মেছিলেন এবং দেশের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিলেন। চিত্রকলার উদ্ভাবনময়তা, শিল্পসংগঠন শক্তি ও নান্দনিক ভাবনায় কাইয়ুম চৌধুরী পরিণত হয়েছিলেন সাংস্কৃতিক রুচির এক অনন্য নির্মাতায়।

শিল্পকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে একুশে পদক লাভের পর স্বাধীনতা পুরস্কার পান কাইয়ুম চৌধুরী। এছাড়াও শিল্প-সৃজনে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে পেয়েছেন সুফিয়া কামাল পদক। একইভাবে তার পুরস্কারের তালিকায় রয়েছে শেলটেক পুরস্কার, সুলতান পুরস্কারসহ বহু দেশি-বিদেশি পুরস্কার-সম্মাননা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নোট ডিজাইন এবং ম্যুরাল কমিটির সদস্য ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। বাংলাদেশে প্রচলিত কয়েকটি টাকার নোটের ডিজাইন তারই করা।

প্রাথমিক জীবন
কাইয়ুম চৌধুরী ১৯৩২ সালের ৯ মার্চ ফেনী জেলায় ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী ছিলেন সমবায় বিভাগের পরিদর্শক। পরবর্তীতে তিনি সমবায় ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নোয়াখালীর গোপাল হালদারের সঙ্গে ছিল তার সখ্য। কুমিল্লায় গায়ক মোহাম্মদ হোসেন খসরু এবং লোকগানের সাধক শচীন দেববর্মণের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। চট্টগ্রামের আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদের সঙ্গে তাদের পারিবারিক যোগাযোগ ছিল। বাবার বদলির চাকরির সুবাদে কাইয়ুম চৌধুরী বাংলার অনেক এলাকায় ঘুরে ফিরেছেন।

শিক্ষাজীবন
মক্তবে কাইয়ুম চৌধুরীর শিক্ষার হাতেখড়ি, তারপর ভর্তি হন চট্টগ্রামের নর্মাল স্কুলে। এরপর কিছুকাল কুমিল্লায় কাটিয়ে চলে যান নড়াইলে। চিত্রা পাড়ের এই শহরে কাটে তার তিনটি বছর। সেখান থেকে সন্দ্বীপে ভর্তি হন প্রথমে সন্দ্বীপ হাইস্কুল ও পরে কারগিল হাইস্কুলে। এরপর নোয়াখালী জেলা সদরে কিছুকাল কাটিয়ে পিতার সঙ্গে তার ঠাঁই বদল হয় ফেনীতে। ভর্তি হলেন ফেনী হাইস্কুলে, সেখান থেকে যান ফরিদপুরে। ফরিদপুর থেকে ময়মনসিংহ এসে ১৯৪৯ সালে সিটি কলেজিয়েট স্কুল থেকে যখন ম্যাট্রিক পাস করেন। স্কুলজীবন থেকে আঁকাআঁকির প্রতি ঝোঁক দেখা গিয়েছিল কাইয়ুম চৌধুরীর।

১৯৪৯ সালে আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে কাইয়ুম চৌধুরী কৃতিত্বের সঙ্গে শিক্ষা সমাপন করেন ১৯৫৪ সালে। তিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে। সদ্য-প্রতিষ্ঠিত আর্টস ইনস্টিটিউটের নবীন শিক্ষার্থীরা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ইমদাদ হোসেন, মুর্তজা বশীর, আমিনুল ইসলাম, দেবদাস চক্রবর্তী প্রমুখ ছিলেন প্রতিবাদী আয়োজনের নিরলস কর্মী এবং সকল মিছিলের পুরোভাগে।

শিক্ষাজীবন প্রসঙ্গে পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘আমি আমার শিল্পীজীবন যখন শুরু করি আমার সঙ্গে যারা ছিলেন কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, গায়ক এদের সবার মধ্যে একটা যোগাযোগ ছিল। আমার বন্ধুস্থানীয়দের মধ্যে আমার খুব ঘনিষ্ঠতম বন্ধু- যার সঙ্গে আমি একই সঙ্গে রাতও কাটিয়েছি, তিনি সৈয়দ শামসুল হক। তারপর শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, হাসান হাফিজুর রহমান, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর। আমরা এক সময় একই সঙ্গে কাজ করতাম। সেই সময় গায়কদের মধ্যে যেমন আবদুল আলীম সাহেবকে দেখেছি যে, কবি জসীম উদ্দীন তাকে গান শেখাচ্ছেন। জসীম উদ্?দীন সাহেব তার ভাঙা গলায় সুর তুলে দিচ্ছেন আবদুল আলীমের গলায়, নীনা হামিদের গলায়, এগুলো তো আমাদের চোখের সামনে দেখা। মিউজিশিয়ানদের মধ্যে, আজকে যেমন সমর দাস, আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু।’

কর্মজীবন
কাইয়ুম চৌধুরী ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত নানা ধরনের ব্যবহারিক কাজ করেছেন, বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, আর বইয়ের প্রচ্ছদ ও সচিত্রকরণের কাজ করেছেন। সিগনেটের বই কাইয়ুম চৌধুরীর জন্য ছিল এক অনুপম নির্দশন। সাময়িক পত্রিকা বিষয়ে আগ্রহী কাইয়ুম চৌধুরী, ছায়াছবি নামে একটি চলচ্চিত্র সাময়িকী যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেছিলেন কিছুকাল। সুযোগমতো টুকটাক প্রচ্ছদ আঁকছিলেন এবং এই কাজের সূত্রেই পরিচয় সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে। ১৯৫৫ সালে তার দুই বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন, কিন্তু প্রকাশক অপারগ হওয়ায় সে-বই আর আলোর মুখ দেখেনি। প্রচ্ছদে একটি পালাবদল তিনি ঘটালেন ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত জহুরুল হকের সাত-সাঁতার গ্রন্থে। গ্রন্থের বক্তব্যের বা সারসত্যের প্রতিফলন ঘটালেন প্রচ্ছদে, একই সঙ্গে গ্রাফিক ডিজাইনে কুশলতা ও নতুন ভাবনার ছাপ মেলে ধরলেন। এমনি দক্ষতার যুগল মিলনে আঁকলেন ফজলে লোহানী রচিত কথাসরিৎসাগর-এর প্রচ্ছদ যা প্রকাশিত হয়নি। গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদের সচিত্র সন্ধানী পত্রিকার আত্মপ্রকাশ তার অঙ্কন, টাইপোগ্রাফিবোধ ও রসসিঞ্চিত তির্যক রচনা প্রকাশের মাধ্যমে হয়ে উঠেছিল অনবদ্য। ১৯৫৭ সালে কাইয়ুম চৌধুরী আর্ট কলেজে শিক্ষকতায় যোগ দেন।

শিল্পভাবনা
১৯৫৭ সালে সতীর্থ আমিনুল ইসলাম ও সৈয়দ জাহাঙ্গীরকে নিয়ে কাইয়ুম চৌধুরী গিয়েছিলেন কলকাতায়।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের তরুণ কর্মকর্তা জিওফ্রে হেডলির আহ্বানে এই সফর। কলকাতায় দেখা করেছিলেন সত্যজিৎ রায় ও খালেদ চৌধুরীর সঙ্গে। ১৯৫৯ সালে বন্ধুবর গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদের সন্ধানী প্রকাশনী যাত্রা শুরু করে জহির রায়হানের ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে।

১৯৬১ সালে মাওলা ব্রাদার্স সৃজনশীল প্রকাশনার অধ্যায় উন্মোচন শুরু করে আবদুশ শাকুরের ‘ক্ষীয়মাণ’ এবং সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যগ্রন্থ ‘একদা এক রাজ্যে’ প্রকাশ দ্বারা। এই দুই প্রকাশনা সংস্থার কাজের পেছনে বরাবরই কাইয়ুম চৌধুরী সক্রিয় থেকেছেন। তিনি আরও প্রচ্ছদ আঁকেন ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে।

১৯৫৯ এবং ১৯৬১ সালে রেলওয়ের টাইমটেবিলের প্রচ্ছদ এঁকে সেরা পুরস্কারটি লাভ করেন কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি ১৯৬০ সালে তাহেরা খানমের সঙ্গে পরিণয়-বন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি ছিলেন আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়া প্রথম চারজন ছাত্রীর একজন। মনের সাযুজ্য তার শৈল্পিক প্রয়াসের জন্য অনুকূল ছিল এবং স্ত্রীর ভূমিকা প্রেরণাদায়ক ছিল। ১৯৬১ সালে ডিজাইন সেন্টার ছেড়ে অবজাভার হাউসে চিফ আর্টিস্ট হিসেবে যোগদান করেন। অবজারভার পত্রিকার রোববারের সাময়িকীতে ডিজাইন নিয়ে যেসব নিরীক্ষা করতেন তার শিক্ষক জয়নুলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

শিল্পরীতি
তেল রঙ, জল রঙ, কালি-কলম, মোমরং, রেশমছাপ ইত্যাদি নানা মাধ্যমে কাইয়ুম চৌধুরী কাজ করেছেন। তার প্রকটি প্রবণতা জ্যামিতিক আকৃতির অনুষঙ্গ। বস্তুত তার ছবি নকশা প্রধান। বর্ণিল পটভূমিতে মোটাদাগের নকশা তার প্রধানতম অঙ্কনশৈলী। অন্যদিকে কাইয়ুম চৌধুরীর চিত্রাবলী বর্ণোজ্জ্বল;- এই দিক থেকে আঁরি মাতিসের সঙ্গে তার সমিলতা লক্ষণীয়। লাল, নীল, সবুজ এই তিনটি রঙ তিনি প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করে থাকেন। এই বর্ণভঙ্গি তার চিত্ররীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তার ক্যানভাসের আয়তন প্রায়শঃ বর্গাকার।
এছাড়া তার চিত্রাবলিতে এদেশের লোকশিল্পসুলভ পুতুল, পাখা, হাঁড়ি, শীতলপাটি, কাঁথা ইত্যাদির পুনঃপৌণিক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

সম্মাননা
কাইয়ুম চৌধুরী ১৯৮৪ সালে একুশে পদক, ২০১৪ সালে স্বাধীনতা পদক, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, ১৯৭৫ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের শ্রেষ্ঠ প্রচ্ছদ পুরস্কার, ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, সুলতান পদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়া শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ২০১০ সালে সুফিয়া কামাল পদক লাভ করেন। প্রতিক্রিয়ায় শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘এমন একজন মহীয়সী নারীর নামাঙ্কিত পদক আমাকে প্রদান করা হয়েছে, জানি না আমি এর যোগ্য কি-না। আমি এর জন্য আনন্দিত এবং গর্বিত। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কাছে আমি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’

কাইয়ুম চৌধুরীর ৭৮তম জন্মবার্ষিকীতে সৈয়দ শামসুল হক বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী।’ মুস্তাফা মনোয়ার বলেন, ‘সত্যজিত রায়ের পর গ্রাফিক্স কিংবা প্রচ্ছদ শিল্পকে তিনি অন্যরকম অবস্থানে নিয়ে গেছেন।’ কামাল লোহানী বলেন, ‘কাইয়ুম চৌধুরী আমাদের চলার পথে সংগ্রামী সাথী।’ অধ্যাপক বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর বলেন, ‘তার মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।’ তিনি ২০১৪ সালে শহীদ আলতাফ মাহমুদ পদকে ভূষিত হয়েছেন।

মৃত্যু
২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর কাইয়ুম চৌধুরী বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ক্ল্যাসিকাল মিউজিক ফেস্টিভালে তার বক্তব্য দেওয়ার সময় হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখান থেকে তাকে সি এম এইচ- এ নিয়ে গেলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অস্থায়ী মঞ্চে শিল্পীর মরদেহ রাখা হয়। এরপর শ্রদ্ধা জানাতে ঢল নামে মানুষের। শুরুতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে