আলোর দিশারি কামাল লোহানী

0
138

বিশিষ্ট সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ; স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনসহ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। সবসময় যুক্ত থেকেছেন নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। প্রয়াত এ মনীষীকে নিয়ে প্রতিবেদনগুচ্ছ সাজিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আলতাফ হোসেন

ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার ঝাণ্ডাধারী

বিশিষ্ট সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী। ‘সংক্ষিপ্ত’ নামে পরিচিত হলেও তার ভালো নাম আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। সাংবাদিকতা দিয়ে পেশাজীবন শুরু করলেও নানা সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন সবসময়। এদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ; স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনসহ সর্বক্ষেত্রে সোচ্চার ছিলেন তিনি। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৫ সালে সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে।
গত শনিবার (২০ জুন) সকালে রাজধানীর মহাখালীতে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কামাল লোহানী। বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যার পাশাপাশি করোনায়ও আক্রান্ত ছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।
কামাল লোহানী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গঠিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ‘আমরা বিজয় অর্জন করেছি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে।’ খুব সংক্ষিপ্তভাবে এককথায় বলেছিলেন কামাল লোহানী, তারপর নিজেরা মেতেছিলেন বিজয় উদযাপনে, সেই সঙ্গে গোটা দেশও।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন কামাল লোহানী। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর কলকাতা সফর উপলক্ষে দমদম বিমানবন্দরেও ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন তিনি। দেশ স্বাধীন হলেও প্রশাসনে পরিবর্তন আসেনি বলে বেতারের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ১৯৭৩ সালে সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন। সরকার ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন সংবাদপত্র এ্যানালমেন্ট অধ্যাদেশ জারি করে মাত্র চারটি পত্রিকা ছাড়া সব পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। নির্মল সেন ও কামাল লোহানী বাকশালে যোগদানে অস্বীকৃতি জানান। ফলে চাকরিহীন অবস্থায় ১৯৭৭ সালে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বার্তা’র নির্বাহী সম্পাদক হন। ১৯৭৮ সালে তাকে সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

জন্ম

১৯৩৪ সালের ২৬ জুন সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া থানার খান শনতলা গ্রামে কামাল লোহানী জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী। মা রোকেয়া খান লোহানী।

পড়াশোনা

মাত্র সাত বছর বয়সে মাকে হারান কামাল লোহানী। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যে কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে ১৯৪৮ সালে পাবনায় চলে আসেন। ভর্তি হন পাবনা জিলা স্কুলে। ১৯৫২ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ভর্তি হন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। এই কলেজ থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন তিনি।

সংসার জীবন

১৯৬০ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন চাচাত বোন দীপ্তি লোহানীর সঙ্গে। এই দম্পতির এক পুত্র ও দুই কন্যা রয়েছে। তারা হলেনÑ সাগর লোহানী, বন্যা লোহানী, ঊর্মি লোহানী। দীপ্তি লোহানী ২০০৭ সালের ২৪ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

সাংবাদিকতা ও কর্মজীবন

ঢাকায় আসেন জীবনের তাগিদে কামাল লোহানী। চাচাত ভাই ফজলে লোহানীর সহায়তায় ১৯৫৫ সালে দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় যোগদানের মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন।
এরপর দৈনিক আজাদ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক বার্তাসহ বিভিন্ন পত্রিকার কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯৭৩ সালে দৈনিক জনপদ পত্রিকাতে যোগদানের মাধ্যমে পুনরায় সাংবাদিকতা পেশায় ফিরে আসেন। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবার্তা, এরপর দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। ১৯৭৭ সালে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত দৈনিক বার্তার নির্বাহী সম্পাদক ও ১৯৭৮ সালে সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৮১ সালে দৈনিক বার্তা ছেড়ে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে যোগ দেন। তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নে দু’দফায় যুগ্ম-সম্পাদক এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক নিযুক্ত হন।
১৬ মাস মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর তিনি পুনরায় বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে চলে আসেন। ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পুনরায় তিনি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর অবসরে যান।

রাজনৈতিক জীবন

ছাত্রজীবনে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন কামাল লোহানী। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষা আন্দোলনে জড়িত হন। ১৯৫৩ সালে এডওয়ার্ড কলেজে নুরুল আমিন ও অন্যান্য মুসলিম লীগ নেতার আগমনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের এক প্রতিবাদী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে গ্রেফতার হন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের রাজনৈতিক মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অনেকের সঙ্গে পুনরায় গ্রেফতার হন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদসহ তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কারাবাস করেন। ১৯৫৫ সালের জুলাইতে জেল থেকে মুক্তি লাভ করে ঢাকা চলে আসেন। মার্ক্সবাদি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হন। এ সময় তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির রাজনীতি করতেন। ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের সময় অনেকের সঙ্গে আত্মগোপন করেন। ১৯৬২ সালেও কারাবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সদস্য ছিলেন।

সাংস্কৃতিক জীবন

কামাল লোহানী বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে নৃত্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং পাকিস্তান সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হিসেবে কয়েকটি দেশে অংশগ্রহণ করেন। এসময় তার নৃত্যগুরু ছিলেন জি এ মান্নান। মান্নানের প্রযোজনায় তিনি ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ নাট্যে অংশ নেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে পাকিস্তান সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কামাল নিষেধাজ্ঞা উপক্ষো করে ছায়ানটের নেতৃত্বে জন্মশতবার্ষিকী পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি ছায়ানট সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৭ সালের ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও উদ্বোধন করেন। এসময় তিনি ‘ধানের গুচ্ছে রক্ত জমেছে’ নামক একটি গণসংগীত অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। ‘আলোর পথযাত্রী’ নাটক পরিচালনার পাশাপাশি এতে অভিনয় করেন। ‘জ্বলছে আগুন ক্ষেতে ও খামারে’ নামক একটি নৃত্যনাট্যে বিবেকের ভূমিকায় নৃত্য পরিবেশন করেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তির সঙ্গে তিনি আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।
চার বছর উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি ছাড়াও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা ছিলেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ

কামাল লোহানী বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- আমরা হারবো না, সত্যি কথা বলতে কী, যেন ভুলে না যাই, মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার, রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলা বেতার, মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার, এ দেশ আমার গর্ব, আমাদের সংস্কৃতি ও সংগ্রাম, লড়াইয়ের গান, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নৃত্যশিল্পের বিস্তার, দ্রোহে প্রেমে কবিতার মতো, শব্দের বিদ্রোহ, ব্যক্তিগত জীবন।

সম্মাননা

২০১৫ সালে সাংবাদিকতায় একুশে পদক লাভ করেন কামাল লোহানী। এছাড়াও তিনি কলকাতা পুরসভার দ্বিশতবর্ষ সম্মাননা, প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সম্মাননা, রাজশাহী লেখক সংঘ সম্মাননা, ক্রান্তি স্মারক, ঋষিজ সম্মাননা ও স্মারক, জাহানারা ইমাম পদকসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

মৃত্যু

গত ২০ জুন রাজধানীর মহাখালীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন কামাল লোহানী। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুস ও কিডনির জটিলতা ছাড়াও হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের সমস্যাতেও ভুগছিলেন। কামাল লোহানীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় ১৭ জুন সকালে তাকে হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সংক্রামক করোনাভাইরাস টেস্টের ফলাফলে কামাল লোহানীর পজিটিভ বলা হয়। এরপর তাকে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে