অনুগল্পঃ ফটোস্টুডিও,লেখক মোঃ নাজমুল ইসলাম আঁখি

0
192

———————————————
প্রায় এক যুগ আগের ফটো।
ফটোতে আমার দুই বোন আর মাঝখানে আমি।
বাবার ভয়ে, লুকিয়ে ফটো তোলতে গেছিলাম ফটোস্টুডিওতে। ফটোস্টুডিও শব্দটা আমার কাছে তখন নতুন। জানিনা এটা দিয়ে কি হয়।
বাবা ছবি তোলা পছন্দ করতনা। তাই বাবাকে ফাঁকি দিয়ে আমরা তিনজনে এই কাজটা করেছি।

সন্ধ্যা বেলা সিদ্ধান্ত নিলাম, কালকে কেউ স্কুলে যাবনা। খুব সকালেই আমরা ফটোস্টুডিওতে যাব। মেজো আপু বিষয়টা মা কে জানিয়ে রাখল। সেই সাথে বাবার কাছে গিয়ে পরিক্ষার ফি এর জন্য টাকা চাইলাম। বাবা বললো, সকালে দিবে। পরিক্ষার ফি এর নাম করে ফটো তোলার জন্য টাকা নিতে হবে, এ-ই বুদ্ধিটা ছিলো মেজোআপুর। কারন বারার কাছে যদি ফটো তোলার জন্য টাকা চাইতাম, তাহলে দিত না।

আমরা রাতেই নতুন কাপড়চোপড় বের করে রাখলাম। কে কোন কাপড় পড়বে, কাকে কোন পোশাকে মানাবে তা পড়ে দেখতে লাগলাম।
রাতে খাওয়া – দাওয়া করে খুব তারাতারি শুয়ে পরি।

এটা ছিল বর্ষা ঋতু। ভোর থেকে বৃষ্টি হচ্ছিল।
মেজো আপুর একটা চেইন ঘড়ি ছিল। আপু বললো এখন সকাল আটটা বাজে। এই বৃষ্টিতে এখন কি করে যাব। আর আমি কিন্তু খুব ভোরেই উঠে কাপড় পড়ে নিয়েছি।
কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টি থেমে গেল। মা এসে বলে, তোরা গেলে দুই বোন যা, নাজমুল থাক।
বৃষ্টির দিনে ওকে যেতে হবেনা।
মায়ের কথা শুনে আমি তো কান্নায় ভেঙে পড়লাম। মাটিতে গোড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতেছি।
অবশেষে মা সবাইকে যাওয়ার সম্মতি দিলো।
আমরা সবাই খাওয়া দাওয়া করে বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে যে যার মতো স্কুলের নাম করে বেরিয়ে পরলাম।

বড় রাস্তার ধারে তিন জনে একত্র হলাম। রাস্তায় অনেক কাদা। অনেকক্ষণ ধরে ভ্যানগাড়ির জন্য অপেক্ষা করতেছি। কিন্তু বৃষ্টির দিনে একটি ভ্যানগাড়িও বের হইনি।
কি আর করার সবাই পায়ে হেঁটে রওনা দিলাম। প্রায় ৩/৪ কিলো রাস্তা! ফটোস্টুডিওতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ১১ টা বেজে গেল।
রাস্তায় আসার সময় আমার প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত ভিজে গেছে। আমরা পাশের ঘরে গিয়ে কাপড়চোপড় বদলে নিলাম। ফটোগ্রাফি লোকটা সুন্দর করে তিনটি ফটো তোললো। আর বলল, এখন বিদ্যুৎ নেই, তোমরা বরং বিকেলে এসে ফটোগুলো নিয়ে যিও। কিন্তু আমরা তখনো সেখানে বসে অপেক্ষা করলাম, যদি এর মধ্যেই বিদ্যুৎ চলে আসে সেই আশায়। অবশেষে দুপুর ১ টার দিকে বিদ্যুৎ এলো।
মেজোআপু লোকটাকে বললো আপনি কাজ করেন। আমরা কিছু খিয়ে আসি……!

চায়ের দোকান দু একটা খোলা ছিল। স্কুল মাঠে ঝালমুড়ি ওয়ালা তখনো ঝালমুড়ি বিক্রি করছে। আমরা তখন তিন জনে দুই টাকার করে ছয় টাকার ঝালমুড়ি কিনে নিলাম। প্রচন্ড ঝালে আমার চোখে পানি চলে আসে। আপুকে বললাম পানি খাব। হোটেলে গিয়ে পানি খেলাম। সাথে একটা করে রুটিও খেলাম। কারন খুব খিদে পিয়েছিল তখন।

প্রায় তিনটা বেজে গেছে। আকাশের অবস্থা ভালোনা। আকাশে বাদল ভাসছে। দু এক ফোটা করে বৃষ্টি পড়তে পড়তে খুব দরদর করে বৃষ্টি পড়তে লাগলো। আমরা এলোপাথাড়ি দৌড়াতে দৌড়াতে ফটোস্টুডিও তে এলাম।
—তোমরা কোথায় গেছিলে? তোমাদের জন্য অনেকক্ষণ ধরে বসে আছি। এই নাও ফটোগুলো।
মেজোআপু পঞ্চাশ টাকা দিয়ে ফটোগুলো নিলো। আমরা তখন বারান্দায় বসে রইলাম। লোকটা স্টুডিওতে তালা মেরে দিয়ে বললো,
–তোমরা বাসায় চলে যাও, এই বৃষ্টি মনে হয় থামবেনা।
লোকটা পা থেকে মাথা পর্যন্ত একটা পোশাক পরেছে। মোটরসাইকেল নিয়ে লোকটা চলে গেল। তখন পোশাকটার নাম জানতাম না। পোশাকটাকে রেইনকোড বলা হয়।

এইযে বৃষ্টি শুরু হলো আর থামলোনা। ফটোর কথা ভুলেগেছি। সব আনন্দ হারিয়ে গেছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয় ভাব ভাব। আমি বাড়ি যাওয়ার জন্য কান্না করতেছি। এমন সময় একটা লোক ফটোস্টুডিওর দিকে আসতেছে। দূর থেকে ঠিক চেনা যায়না। ছাতা হাতে তাই মুখটা অর্ধেক ঢেকে গেছে। মেজোআপু বললো, লোকটাকে বাবার মতো দেখাচ্ছে। কাছাকাছি যখন এলো তখন দেখা যায় ঐটা সত্যিই বাবা। আমার বোন গুলো ভয়ে কাঁপতেছে। আমি দৌড়ে বাবার কাছে যায়। বাবার মুখটা রাগে ভারি হয়ে গেছে। তবু রাগ করলোনা, মারলোনা।
বাবা বললো, বাড়ি চলো। আমরা তিন ভাই বোন বাবার কথা শুনে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম।
তার মানে মা সবকিছু বাবাকে বলে দিয়েছে। আমরা যে এখানে এসেছি বাবা জানে। পরিক্ষার ফি এর টাকা দিয়ে এখানে এসেছি বাবা তাও জানে।
অতঃপর ভিজতে ভিজতে সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে এলাম।
মনে মনে বলতে থাকি, আজ বাবা না থাকলে কি যে হতো….!

(প্রথম লেখাঃ ৩০/০৪/২০২০)
সরকারি মোসলেমউদ্দিন কলেজ
হরিপুর, ঠাকুরগাঁও

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে